1. mskamal124@gmail.com : thebanglatribune :
  2. wp-configuser@config.com : James Rollner : James Rollner
ট্রাম্পের সাম্রাজ্যবাদী নীতি ও ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর ভবিষ্যৎ-আকতারুল ইসলাম - The Bangla Tribune
এপ্রিল ৩, ২০২৫ | ২:৫৭ অপরাহ্ণ

ট্রাম্পের সাম্রাজ্যবাদী নীতি ও ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর ভবিষ্যৎ-আকতারুল ইসলাম

  • প্রকাশের সময় : শনিবার, মার্চ ৮, ২০২৫

ট্রাম্পের সাম্রাজ্যবাদী নীতি ও ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর ভবিষ্যৎ

আকতারুল ইসলাম
নয়া ঔপনিবেশিক বিশ্ব ব্যবস্থায় এখনও অনেকটাই একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রেখেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছোটখাটো এবং মাঝারি মাপের পরাশক্তির আবির্ভাব ঘটলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ হতে পারেনি কোন দেশ। নব্বইয়ের দশকে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র দুর্দন্ড প্রতাপশালী শক্তি হিসেবে বিশ্বমঞ্চে আবির্ভূত হয়েছে। তবে সাম্প্রতিককালে চীনের ক্রমবর্ধমান অগ্রগতি ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বাড়িয়ে দিয়েছে। এতদসত্ত্বেও, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দেদীপ্যমান সূর্য জাজ্বল্যমান। ট্রাম্পের দ্বিতীয় দফায় প্রেসিডেন্ট হিসেবে আগমন সাম্রাজ্যবাদের সেই সূর্য থেকে আরও বেশি করে উত্তাপ নির্গত হতে শুরু করেছে।
২০ জানুয়ারি ২০২৫, ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭ তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণকালের সূচনা বক্তব্যে বলেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে, ‘একটি উদীয়মান জাতি হিসেবে বিবেচনা করবে এবং এমনভাবে তা করবে যেন তার দেশের সম্পদ বাড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড সম্প্রসারিত হয়।’
ট্রাম্পের বক্তব্যের সারবত্তা হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আয়তন উত্তর আমেরিকা থেকে ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃত করার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার আগাম পূর্বাভাস। ইতিমধ্যে তিনি কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১ তম অঙ্গরাজ্যে পরিণত করার ঘোষণা দিয়েছেন এবং দেশটিকে সংযুক্ত করে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন মানচিত্র প্রকাশ করেছেন। শুধু তাই নয়, তিনি কানাডার সামরিক শক্তিমত্তাকে হেয় করে কথা বলেছেন এবং দেশটিকে যুক্তরাষ্ট্রে যোগদান করানো গেলে কানাডিয়ানরা কি সুযোগ সুবিধা পাবেন তারও ফিরিস্তি তুলে ধরেছেন। জবাবে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন আগ্রাসী মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ করেছেন এবং কানাডার ল’মেকার এলিজাবেথ মে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন, ওরিগন এবং আগুনে জ্বলতে থাকা ক্যালিফোর্নিয়ার মত অঙ্গরাজ্যগুলোকে কানাডার নতুন প্রদেশ হিসেবে কিনে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন।
ট্রাম্পের কথাকে শুধুমাত্র লোকরঞ্জনবাদী গালগল্প বলে মনে করার এবং কানাডা সামরিক সক্ষমতায় যে অত্যান্ত কমজোর তা নিয়ে কোন বিতর্কের অবকাশ নাই। খামখেয়ালিপনার বশবতী হয়ে যদি মার্কিন বাহিনী কানাডা আক্রমণ করে বসে, তাহলে গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার ইনডেক্স-এ ২৮ তম অবস্থানে থাকা কানাডার প্রায় ৭২ হাজার নিয়মিত এবং ৩০ হাজার সংরক্ষিত সেনার ক্ষুদ্র সামরিক বাহিনীর পক্ষে আমেরিকার বিরুদ্ধে কতটুকু প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হবে!
অপরদিকে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ডেনমার্কের আওতাধীন স্বায়ত্তশাসিত ভূখণ্ড গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিক্রি করার পরামর্শ দিলেও দ্বিতীয় মেয়াদে এসে তিনি দেশটাকে দখল করতে চাইছেন। কোন প্রকার রাখঢাক না রেখেই তিনি তার উচ্চাভিলাসী মনোভাব অকপটে বলে দিয়েছেন। ট্রাম্পের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন বলে দিয়েছেন,” গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয়”।

ট্রাম্পের কদর্য দৃষ্টিভঙ্গি শুধুমাত্র উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের ভৌগলিক পরিমন্ডলে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি মধ্য আমেরিকার দেশ পানামার আওতাধীন পানামা খালের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি জানিয়ে রেখেছেন। এমনকি খালটি দখল করার জন্য সামরিক হস্তক্ষেপের মত সম্ভাবনার কথাও নাকচ করে দেননি। তিনি কোন প্রকার তথ্য প্রমাণ ছাড়াই দাবি করছেন যে, এই খালটি চীন অতি উচ্চ অর্থের বিনিময়ে পরিচালনা করছে।
ট্রাম্প এখানেই থেমে থেমে থাকেননি। তিনি ইসরাইলি আগ্রাসনে ধ্বংসপ্রাপ্ত গাজা উপত্যকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার মত দুঃসাহসিক ও নিন্দনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলে আসছেন। তিনি গাজা উপত্যকায় বসবাসরত ফিলিস্তিনি নাগরিকদের মধ্য প্রাচ্যের অন্য কোন দেশে সরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। যার প্রতিক্রিয়ায় আরব দেশগুলোতে নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় বয়ে যাচ্ছে। জর্ডানের বাদশা ট্রাম্পের মুখের সামনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফিলিস্তিন নীতির বিরোধিতা করেছেন।
আপাতদৃষ্টিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন বক্তব্যকে খামখেয়ালীপনা সুলভ বাতুলতা মনে হলেও যুক্তরাষ্ট্রের অন্য দেশের ভূমি দখলের অতীত ইতিহাস ঘাটলে সবকিছুকে হালকাভাবে উড়িয়ে দেওয়ার অবকাশ কমই রয়েছে। ট্রাম্প যদি তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনে সামনে অগ্রসর হতে থাকেন, তাহলে বিশ্বের অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সামনে তাদের সম্প্রসারণবাদ নীতি বাস্তবায়ন করার অবারিত সুযোগ তৈরি হবে এবং সাম্রাজ্যবাদের এই নতুন খেলা বাংলাদেশের মত ছোট রাষ্ট্রগুলোর ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে ঠেলে দিবে। বলাবাহুল্য, আওয়ামীলীগের শাসনামলে সেইন্ট মার্টিন দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি বানানোর গুজব অনেকেই মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে। সেইন্ট মার্টিন দ্বীপ সম্পর্কিত যেকোন সংবাদ অনেক মানুষের মনেই সন্দেহের উদ্রেক করে।
ট্রাম্পের সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব ভারতের বহুল আলোচিত ‘অখন্ড ভারত’ রূপকল্পকে বাস্তব রূপ দিতে উৎসাহিত করবে। এটা ঠিক যে বর্তমান সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার ভারতের প্রভাব বলয় খর্ব হয়েছে। অতি সম্প্রতি মালদ্বীপ থেকে ভারতের বিতাড়িত হওয়া এবং বাংলাদেশ থেকে তাদের তাঁবেদার সরকারের উৎখাত, নিশ্চিতভাবেই ভারতকে ইতিহাসের দুর্বলতম অবস্থানে নিয়ে গেছে। তবে তারা যে একদমই বসে নেই তা তাদের সাম্প্রতিক কান্ডকারখানা দেখলে সহজেই অনুমান করা যায়। ট্রাম্পের সাম্রাজ্যবাদী তৎপরতা ভারতকে পুরোনো খেলায় ফিরে আসতে প্রেরণা দিবে।
এদিকে তাইওয়ানকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে অন্তর্ভুক্তি নিয়ে চীনের রয়েছে সুদূরপ্রসারী চিন্তা। ট্রাম্পের আগ্রাসী মনোভাব পশ্চিমা চাপের মুখে পড়ে ধীর গতিতে এগিয়ে যাওয়া চীনকে তার তাইওয়ান দখলের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে অনেকটাই এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করবে। শুধু তাইওয়ান দখলই নয়, চীনের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোকে চীনের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা অথবা চীনের তাঁবেদার রাষ্ট্র বানিয়ে নতুন চৈনিক সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠার পথকে ত্বরান্বিত করবে অবধারিতভাবেই। চীনা ঋণনির্ভর মিয়ানমার, মঙ্গোলিয়া ও বাংলাদেশের মত রাষ্ট্রগুলোও চীনা প্রভাব বলয়ের বাইরে গিয়ে কতটুকু স্বাধীন সত্তা বজায় রাখতে পারে তা নিয়ে যথেষ্ট চিন্তার অবকাশ রয়েছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন সংকট সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর রাশিয়ান ইউনিয়নে অন্তর্ভুক্ত হবার সমূহ সম্ভাবনা তৈরি করেছে। পুতিনের সাম্রাজ্যবাদী মনোভাবের কাছে নামমাত্র স্বাধীন রাষ্ট্রগুলো কতটা স্বাতন্ত্র বজায় রাখতে সক্ষম হবে তা সময়ই বলে দেবে। তবে পুরো ইউরোপের সামনে রাশিয়ার নতুন জার পুতিন যে মূর্তিমান আতঙ্কের নাম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন তা খুব সহজেই অনুমান করা যায়। ট্রাম্পের ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটো জোটের প্রতি বৈরি মনোভাব প্রদর্শন ইউরোপের দেশগুলোকে রাশিয়ার খোলা টার্গেটে পরিণত করবে।
সিরিয়ার সাবেক স্বৈরশাসক বাশার আল আসাদের পতন ও পলায়ন এবং গাজা ইস্যু নিয়ে ট্রাম্পের পরিকল্পনা মধ্যপ্রাচ্যে গ্রেটার ইসরাইল বাস্তবায়নের সম্ভাবনাকে দিন দিন স্পষ্ট করে তুলছে। বহুল আলোচিত এই গ্রেটার ইসরাইল বাস্তবায়নের অর্থই হলো জর্ডান, সিরিয়া, লেবানন, মিশর ও তুরস্কের মতো রাষ্ট্রের ললাটে অমানিশা নেমে আসা। ইউফ্রেটিসের অববাহিকা থেকে নীলনদের তীরে ইসরাইলি দখলদারিত্বের নোংরা ইতিহাস রচিত হওয়া। নতুন ওয়াল্ড অর্ডার বাস্তবায়নের প্রেক্ষাপট তৈরি হওয়া।
শরৎচন্দ্রের ‘বিলাসী’ গল্পের সেই সংলাপটি মনে পড়ে গেল। ‘অতিকায় হস্তী লোপ পাইয়াছে, কিন্তু তেলাপোকা টিটিয়া আছে। কানাডা, গ্রিনল্যান্ডের মত বৃহৎ রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ যেখানে বিপন্ন হবার উপক্রম, সেখানে আমাদের বাংলাদেশের মত ছোট রাষ্ট্রের টিকে থাকাটাই এক বিস্ময়কর বাস্তবতা হয়ে উঠতে পারে। এই নব্য ঔপনিবেশিক বাস্তবতায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি মাপের রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে সুসজ্জিত হবার পাশাপাশি নিজেদের মধ্যে প্রয়োজন বিবেচনায় নিরাপত্তা সহায়তা চুক্তি সম্পাদনের দিকে মনোনিবেশ করতে হবে।
বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান ও মালদ্বীপের মত রাষ্ট্রগুলো গত অর্ধ শতকের বেশি সময় ধরে যে বাস্তবতার মধ্যে দিয়ে গেছে তাতে স্পষ্টভাবেই প্রতীয়মান হয়েছে ‘টিকে থাকাটাই সার্থকতা’ নয়। ভারতের মত আগ্রাসী মনোভাবাপন্ন প্রতিবেশীর সামনে স্বমহিমায় টিকে থাকার জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রতি গুরুত্বারোপ করাটাই হবে একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মত পাগলাটে নেতারা বিশ্বকে শুধু হুমকির সম্মুখীন করছেন না, সঠিক সময়ে সঠিক করণীয় সম্পর্কে পরোক্ষ ইঙ্গিতও দিয়ে রাখছেন।
লেখক: তথ্যবিদ, কবি ও গবেষক।
ইমেইল: infoscience475@gmail.com

এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2020