1. mskamal124@gmail.com : thebanglatribune :
  2. wp-configuser@config.com : James Rollner : James Rollner
৩১ দফায় বিএনপির শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ভাবনার প্রাসঙ্গিকতা- আকতারুল ইসলাম - The Bangla Tribune
এপ্রিল ৩, ২০২৫ | ২:৫৪ অপরাহ্ণ

৩১ দফায় বিএনপির শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ভাবনার প্রাসঙ্গিকতা- আকতারুল ইসলাম

  • প্রকাশের সময় : শনিবার, ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২৫

দেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপির ৩১ দফা নিয়ে অনেকের মাঝেই এক প্রকার অনুসন্ধিৎসুতা ও কৌতুহল লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে ২০২৪ এর ৫ আগস্ট, আওয়ামী ফ্যাসিবাদের পতনের পর থেকে ৩১ দফা কেন্দ্রিক আলোচনা সভা ও সেমিনার বিএনপির রাজনীতির পালে নতুন হাওয়া বয়ে এনেছে। বলা বাহুল্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতকে নিয়ে বিএনপির ভাবনা ৩১ দফায় এক অনন্য মাত্রা সংযোজন করেছে।
এ কথায় বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নাই যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতি ছাড়া কোন দেশ ও জাতি উন্নতির শিখরে স্বমহিমায় থিতু হতে পারে না। জাতির আত্মিক ও মানসিক বিকাশে শিক্ষা শক্তিশালী ভিত্তি প্রস্তর রচনা করে দেয় এবং যুগোপযোগী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা জাতির সার্বিক বিকাশকে টেকসই উন্নয়ের মাপকাঠিতে এগিয়ে রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের ৫৪ বছরের কাল পরিক্রমায় এই দুটো খাত বরাবরই অবহেলিত ও উপেক্ষিত থেকে গেছে।
ইউনিসেফ শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত মানোন্নয়ন ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে কোন দেশের সামগ্রিক জিডিপির ন্যুনতম ছয় শতাংশ ব্যয়ের পক্ষে পরামর্শ দিয়েছে। পৃথিবীর অধিকাংশ উন্নত রাষ্ট্রগুলোর শিক্ষাখাতে বরাদ্দ আট থেকে বারো শতাংশেরও বেশি হয়ে থাকে। এমনকি পৃথিবীর উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে মার্শাল আইল্যান্ডস ১৫.৮ এবং কিউবা ১২.৯ শতাংশ শিক্ষাখাতে ব্যয় করে।
আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভুটান শিক্ষায় ৬.৬ শতাংশ, ভারত ও পাকিস্তান তিন শতাংশের কাছাকাছি ব্যয় করে। সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা, দীর্ঘদিনের যুদ্ধবিধস্ত আফগানিস্তানের শিক্ষায় বরাদ্দ ৪ শতাংশের অধিক। অথচ ২০২২—২৩ অর্থ বছরে বাংলাদেশের শিক্ষাখাতে বিনিয়োগ ছিল ১.৮৩ শতাংশ, ২০২৩—২৪ অর্থবছরে ১.৭৬ শতাংশ, এবং আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসনামলের সর্বশেষ বাজেটে শিক্ষাখাতে ১.৬৯ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। যা ইতিহাসের সর্বনিম্ন এবং এক অনভিপ্রেত বিশ্বরেকর্ডও বটে!
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বেহাল দশা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নাই। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে একটা দেশের কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে মোট জিডিপির পাঁচ শতাংশ ব্যয় করা প্রয়োজন। কিন্তু পতিত ফ্যাসিবাদী আওয়ামীলীগ শাসনামলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য দুই শতাংশের খুব বেশি বরাদ্দ রাখা হয়নি। চিকিৎসার জন্য সরকারের ভারত নির্ভর নীতি জনজীবনে নানান দুর্ভোগ ও দুর্গতি বয়ে এনেছে।
এবার আসি বিএনপির ৩১ দফায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সম্পর্কিত আলোচনায়। বিএনপি ২৪ নম্বর দফায় যোগ্য, দক্ষ্য ও মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন জনশক্তি গড়ে তোলার লক্ষ্যে শিক্ষাখাতে জাতীয় বাজেটের ৫ শতাংশ ব্যয়ের প্রতিশ্রম্নতি দিয়েছে। বিদ্যমান বাজেটে যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয় তার সিংহভাগ অংশ চলে যায় শিক্ষক, কর্মকর্তা ও শিক্ষা সহায়ক কমর্চারীদের বেতন—ভাতা পরিশোধ করতে। অবশিষ্টাংশ অর্থ দিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও আনুসাঙ্গিক কাজ সম্পন্ন করা হয়। শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ প্রদান, গবেষণা ও উদ্ভাবনী কাজে অন্তর্ভুক্ত করার মত পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ থাকে না। এক্ষেত্রে বরাদ্দ পাঁচ কিংবা ছয় শতাংশ করা গেলে শিক্ষাখাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সূচিত হবে।
একই দফায় চাহিদাভিত্তিক শিক্ষা (Need-based Education) এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকে জ্ঞানভিত্তিক (Knowledge-based) করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এটা তো দিনের আলোর মত পরিষ্কার যে আমাদের বিদ্যমান শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে দক্ষ ও কর্মক্ষম জনশক্তি গড়ে উঠছে না। গতানুগতিক ধারার সিলেবাস, সনাতনী শিক্ষক নিয়োগ পদ্ধতি, মানহীন পাঠ্য বই এবং সর্বোপরি দূরদর্শিতা বিবর্জিত শিক্ষা নীতি বৈশ্বিক মেধা সূচকে আমাদের অবনমনকে তরান্বিত করে চলেছে। যুগের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়ন না করতে পারলে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ব ব্যবস্থায় আমাদের অবস্থান হবে আফ্রিকার পিছিয়ে পড়া দেশগুলোর সারিতে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের কথা মাথায় রেখে বিএনপি দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির লক্ষ্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতকে ঢেলে সাজানোর উপর জোর দিয়েছে। গবেষণা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের তালিকায় স্থান দিয়েছে।
২৬ নম্বর দফায় শিক্ষা ব্যবস্থার ন্যায় যুগোপযোগী স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করার জন্য জাতীয় বাজেটের পাঁচ শতাংশ বরাদ্দ রাখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য সার্বজনীন স্বাস্থ্য সেবা প্রদানের জন্য স্বাস্থ্য কার্ড চালু করার কথা বলা হয়েছে। স্বাস্থ্য সম্পর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি বলা হয়েছে ২৫ নম্বর দফায়। স্বাস্থ্যকে সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্য সেবার আদলে সার্বজনীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা প্রবর্তন করার বিষয়ে বিএনপির অবস্থান তুলে ধরা হয়েছ। তবে বাংলাদেশের মত দেশে যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য মডেল কতটা কার্যকর হবে এবং কতটা ফলপ্রসূভাবে সম্পাদক করা যাবে তা নিঃসন্দেহে আলাদাভাবে আলোচনা, পর্যালোচনা ও গবেষণার দাবি রাখে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে লোকরঞ্জনবাদ নতুন কোন বিষয় নয়। ক্ষমতাসীনরা বড় বড় ব্রীজ নির্মাণ, জেলায় জেলায় মানহীন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা এবং সর্বোপরি অবকাঠামোগত প্রকল্পে জাতীয় বাজেটের অধিকাংশ ব্যয় করাটাকে তাদের রাজনৈতিক সফলতা হিসেবে দেখিয়ে বাহবা পেতে চান। শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন সাধন করে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা তাদের অগ্রাধিকারের আওতায় পড়ে না। কারণ এটা একটা দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। চার পাঁচ বছরে এর সুফল পাওয়া যায় না। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার টেকসই উন্নয়ন সাধন করতে হলে একটা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগুতে হয়। এমন দূরদর্শী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সদিচ্ছা পূর্ববর্তী কোন সরকারের মধ্যে দেখা যায়নি।
বিএনপির শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতকে নিয়ে সময়োপযোগী ভাবনা প্রশংসার দাবি রাখে। তবে এক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে। বিদ্যমান দুর্নীতিপরায়ণ আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার ভেতরে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কতটা অগ্রগতি সাধন করা যাবে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। তাছাড়া রাষ্ট্রের ভঙ্গুর অর্থনীতি, রাজনৈতিক বিভাজন, রাজনীতিবিদদের অদূরদর্শিতা, এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে সমন্বয় ও আস্থার ঘাটতি প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন যথেষ্ট প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, বিএনপির ৩১ দফা বাস্তবায়ন করাটা অত্যান্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। বিশেষকরে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মত অতি অত্যাবশ্যক ও গুরুত্বপূর্ণ খাতকে ভঙ্গুর অবস্থা থেকে টেনে তুলে শক্তিশালী অবস্থানে দাঁড় করানোর জন্য দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকার প্রয়োজন। সে ধারাবাহিকতা বিএনপি কীভাবে সম্পন্ন করবে? তাছাড়া বিএনপি পরবর্তীতে যারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাবেন তারা কতটা আন্তরিকভাবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের উপর মনোযোগী হবেন তা নিয়েও যথেষ্ট ভাবনা চিন্তার অবকাশ রয়েছে।
যেহেতু জাতীয় নির্বাচনের দিনক্ষণ এখনও ঘোষিত হয়নি, বিএনপির হাতে যথেষ্ট সময় রয়েছে তাদের প্রতিশ্রুতিগুলো নিয়ে আলোচনা ও পর্যালোচনা করার এবং ৩১ দফা বাস্তবায়নের জন্য একটা কার্যকরী রূপরেখা প্রণয়ন করার।

লেখক: তথ্যবিদ, কবি ও গবেষক।

এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2020