1. mskamal124@gmail.com : thebanglatribune :
  2. wp-configuser@config.com : James Rollner : James Rollner
বিএনপির ৩১ দফা বাস্তবায়ন কতটা সহজ!- আকতারুল ইসলাম - The Bangla Tribune
এপ্রিল ৪, ২০২৫ | ৯:১২ পূর্বাহ্ণ

বিএনপির ৩১ দফা বাস্তবায়ন কতটা সহজ!- আকতারুল ইসলাম

  • প্রকাশের সময় : সোমবার, জানুয়ারি ২৭, ২০২৫

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নিজ হাতে গড়া বিএনপি এখন দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী দর্শনকে উপজীব্য করে রাজনীতির জটিত আবর্তে ঘূর্ণায়মান দলটি বাংলাদেশকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথে চালিত করেছে। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থার উচ্ছেদ ঘটিয়ে দেশকে পুনরায় গণতন্ত্রের কক্ষপথে ফিরিয়ে আনতে লড়াই করেছে আপোষহীন মনোরথে।
স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত এই দলটি তার চলার পথে নানান চড়াই উৎরাই পেরিয়ে আজকের অবস্থানে এসে পৌঁছেছে। বিএনপির দীর্ঘ এই পথচলায় কিছু সুনির্দিষ্ট মূলনীতি ও দর্শন দলটিকে গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সবসময়ই প্রাসঙ্গিক করে রেখেছে। ১৯৭৭ সালের ৩০ এপ্রিল, জিয়াউর রহমান ১৯ দফা কর্মসূচি প্রণয়ন করে বিএনপির সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা ও রাষ্ট্র পরিচালনায় দলটির ভূমিকাকে জনগণের সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন।
জিয়ার প্রণীত ১৯ দফাকে ২০২২ সালে পরিমার্জিত ও বিস্তৃত করে বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিপথ ও বাংলাদেশের রাষ্টে্রর ভবিষ্যৎ অভিযাত্রাকে আরও সুসংহত ও সমৃদ্ধ করতে দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান প্রথমে ২৮ দফা এবং ২০২৩ সালে অতিরিক্ত তিনটি দফা সংযুক্ত করে ৩১ দফার এক মহা কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেন। এই ৩১ দফাই এখনকার বিএনপির রাষ্ট্র দর্শন ও ভবিষ্যৎ রাজনীতির বন্ধুর পথে এগিয়ে চলার গুরুত্বপূর্ণ পাথেয়।
এখানে মনে করিয়ে দেওয়া সমীচীন যে, এই দফাগুলোকে এখনও বিএনপির জন্য চূড়ান্ত দলিল হিসেবে গ্রহণ করা হয়নি। দলের বিভিন্ন নীতি নির্ধারণী ফোরামে আলাপ আলোচনা ও বুদ্ধিজীবী সমাজের মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে এখানে সংযোজন ও বিয়োজনের প্রবিধান রাখা হয়েছে। এটা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ এবং এমন মনোভাব প্রদর্শন গণতান্ত্রিক মতামতের প্রতি বিএনপির দায়বদ্ধতাকে যেন আরেকটু স্পষ্ট করেই স্মরণ করিয়ে দেয়।
জনাব তারেক রহমান প্রণীত ৩১ দফায় রাষ্ট্র সংস্কার ও দক্ষ, যোগ্য এবং কর্মতৎপর মানব সম্পদ তৈরির ওপর সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করা হয়েছে । আওয়ামী লীগের মেগা প্রকল্পের ঘেরাটোপের বিপরীতে গিয়ে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর যে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। এই প্রথম কোন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্য সেবার আলোকে সার্বজনীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা প্রণয়ন করা এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করে তোলার জন্য সামগ্রিক জিডিপির পাঁচ শতাংশ ব্যয়ের প্রতিশ্রম্নতির কথা ব্যক্ত করা হয়েছে।
৩১ দফায় রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, প্রতিশোধ ও ঘৃণার সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে সকল মত—পথ, শ্রেণী—পেশা, ও ধর্ম—বর্ণের মানুষের সমন্বয়ে অন্তর্ভূক্তিমূলক, বৈষম্যহীন ও সম্প্রীতিমূলক ‘রেইনবো নেশন’ গড়ার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। বিভ্রান্তিকর বাঙালি জাতীয়তাবাদের কান্ডারি আওয়ামীলীগ ও তাদের দোসররা মুক্তিযুদ্ধের মিথ্যা চেতনার মাধ্যমে যে আকাশসম বৈষম্যের সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল, সেখান থেকে বেরিয়ে এসে গণ মানুষের নাগরিক পরিচয়ের উপর ভিত্তি করে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মানবাধিকার ও সমতাভিত্তিক রাষ্ট্র বির্নিমাণের উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনায়নের কথা বলা হয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ দুই বারে সীমিত করা হয়েছে। যদিওবা এই দুই মেয়াদের বিষয়টি খুব স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি। তবে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে ফিরিয়ে আনা এবং বর্তমান সংবিধানের বিতর্কিত ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে পরীক্ষা—নিরীক্ষা করে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে মতামত প্রদানের প্রবিধান রাখার প্রতি অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে। যদিও এখানে শুধুমাত্র বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। বিষয়টিকে কার্যকর করার উপর তেমন একটা জোর দেওয়া হয়নি।
নির্বাচন কমিশনের সংস্কার ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিধিবিধান সংশোধন করে যুগোপযোগী করার বিষয়ে বিএনপির প্রতিশ্রম্নতির কথা বলা হয়েছে এবং আলোচিত মাসদার হোসেন মামলার রায়ের আলোকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কার্যকর করার বিষয়ে অবস্থান পরিষ্কার করা হয়েছে। সরকারি চাকরিতে প্রবেশ, জনপ্রশাসন, পুলিশ প্রসাশনসহ সর্বক্ষেত্রে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে দেশপ্রেমিক ও যোগ্য নাগরিকদের বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে স্বাধীন ‘মিডিয়া কমিশন’ গঠন করা, দুর্নীতি দূর করতে দুর্নীতি দমন কমিশনের সংস্কার ও এ সংক্রান্ত আইন সংস্কার করা, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য সংস্কার কমিশন, প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন গঠন করার কথা বলা হয়েছে।
আমরা ছোটবেলা থেকেই রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি সাধারণ মানুষের এক প্রকার অবিশ্বাস ও অনাস্থা লালন করতে দেখে আসছি। বিএনপির এই ৩১ দফা নিয়ে অনেকেরই আস্থা ও বিশ্বাসের ঘাটতি তৈরি হলেও হতে পারে। তবে আমরা সবকিছু ইতিবাচকতার আলোকেই দেখতে চাই। আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসনামলের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সবগুলো দফা দীর্ঘ আলোচনা, পর্যালোচনা ও গবেষণার নিরিখে প্রণয়ন করা হয়েছে। যদিও অনেক জায়গায় যথেষ্ট অস্পষ্টতা পরিলক্ষিত হয়েছে।
এতকিছুর পরও এটা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে বিএনপির ৩১ দফা আলাদা গুরুত্ব বহন করছে। দলটি বিভিন্ন সভা সমাবেশে দফাগুলো নিয়ে আলাপ আলোচনা করছে এবং প্রতিটি দফাকে গণমানুষের কাছে বোধগম্য উপায়ে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছে। তবে বিএনপির এই প্রচেষ্টা শুধুমাত্র দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বিরোধী দল ও সমমনা দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ ও সমঝোতার মাধ্যমে একটা সমন্বিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর প্রয়োজন রয়েছে। রাষ্ট্র ক্ষমতায় যে দলই আসুক না কেন ৩১ দফার আলোকে রাষ্ট্র সংস্কার ও মানব সম্পদ তৈরির কাজ যেন বাধাগ্রস্ত না হয় সে বিষয়ে দলগুলোর মধ্যে জাতীয় ঐক্যমত স্থাপন করা জরুরি।
পরিশেষে একথা জোর দিয়েই বলা যায় যে ৩১ দফা বাস্তবায়নের জন্য বিএনপিকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। নিজ দলের নেতা কর্মীদের মধ্যে প্রতিটি দফা সম্পর্কে পরিস্কার ও স্বচ্ছ ধারণা থাকা যেমন আবশ্যক, প্রতিটি দফা বাস্তবায়নের জন্য সবার একান্ত প্রচেষ্টা থাকাটাও সর্বোচ্চ বিবেচ্য বিষয়। দফাগুলো শুধুমাত্র কাগুজে বিষয়ে পরিণত না করে দলের ভেতরে গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করে সৎ, দক্ষ ও মেধাবী মানুষের সমন্বয়ে দফাগুলো বাস্তবায়ন করার জন্য রাষ্টে্রর বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে ব্যপকভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে। বিভিন্ন দল মতকে গুরুত্ব দিয়ে ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে গিয়ে দেশপ্রেমের প্রেরণা নিয়ে স্বাধীন, সমৃদ্ধ ও সার্বভৌম বাংলাদেশ বিনির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। পুরোনো ধ্যান ধারণা ও সেকেলে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ঘেরাটোপে আটকে থাকলে জনাব তারেক রহমানের ৩১ দফা বাস্তবায়ন পর্বতের মূষিক প্রসব করার মত বিষয় হিসেবে বিবেচিত হবে।

লেখক: তথ্যবিদ, কবি ও গবেষক।

এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2020