1. [email protected] : thebanglatribune :
ইসলামে আশুরা এক তাৎপর্যময় দিবস - The Bangla Tribune
সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৩ | ১২:১২ অপরাহ্ণ

ইসলামে আশুরা এক তাৎপর্যময় দিবস

  • প্রকাশের সময় : বুধবার, জুলাই ২৬, ২০২৩

আরবি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মহররম। ইসলামী পরিভাষায় হিজরি সনের প্রথম মাস মহররমের ১০ তারিখকে আশুরা বলে। আশুরা শব্দটি আরবি আশারা থেকে এসেছে। এর অর্থ দশ। আর আশুরা মানে দশম। অন্য কথায় বলতে গেলে মাসের ১০ তারিখ ১০টি বড় বড় ঘটনা সংঘটিত হওয়ার কারণেও এ তারিখকে আশুরা বলা হয়। সৃষ্টির পর থেকে আশুরার দিনে অনেক তাৎপর্যমন্ডিত ঘটনা ঘটেছে বিধায় এই দিনের মর্যাদা ও মহাত্ম অনেক বেশি। হাদিসে চান্দ্রবর্ষের ১২ মাসের মধ্যে মহররমকে মহান আল্লাহর মাস বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পবিত্র কালামে পাকেও মহররম মাসকে অতি সম্মানিত মাস বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, নিশ্চয়ই আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকেই মহান আল্লাহর বিধানে মাস গণনায় মাস ১২টি, তন্মধ্যে চারটি মাস নিষিদ্ধ মাস, এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান (সুরা তাওবা: ৩৬ )। এই আয়াতে আরবায়াতুন হুরুম মানে অতি সম্মানিত ও মর্যাদাপূর্ণ চার মাস বোঝানো হয়েছে। এই মাসগুলো হলো জিলকদ, জিলহজ, মহররম ও রজব। এই চার মাসের মর্যাদা ও মাহাত্মের কারণে তখন যুদ্ধবিগ্রহ নিষিদ্ধ করা হয়। শত্রু -মিত্র-নির্বিশেষে সবাই এই চার মাসের মর্যাদা রক্ষা করে যুদ্ধ-কলহ থেকে দূরে থাকত।

আশুরার দিন বা মহররমের ১০ তারিখ যেসব তাৎপর্যময় ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল, সংক্ষেপে সেগুলো বর্ণিত হলো: ১. এ দিনে মহান আল্লাহ পৃথিবী সৃষ্টি করেন। আর এ দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে। ২. এ দিনে হজরত আদম (আ.) বেহেশত থেকে দুনিয়ায় নেমে আসেন। মহররমের ১০ তারিখে মহান আল্লাহ আদম (আ.) এর দোয়া কবুল করেন এবং এ দিনে তিনি স্ত্রী হাওয়া (আ.) এর সঙ্গে আরাফার ময়দানে সাক্ষাৎ করেন। ৩. হজরত নুহ (আ.) এর জাতির লোকেরা মহান আল্লাহর গজব জোয়ারে পানি ফুলিয়া নিপতিত হওয়ার পর ১০ মহররম তিনি নৌকা থেকে ঈমানদারদের নিয়ে দুনিয়ায় অবতরণ করেন। ৪. হজরত ইবরাহিম (আ.) নমরুদের অগ্নিকুন্ডে নিক্ষিপ্ত হওয়ার ৪০ দিন পর ১০ মহররম সেখান থেকে মুক্তি লাভ করেন। ৫. হজরত আইয়ুব (আ.) ১৮ বছর কঠিন রোগ ভোগ করার পর মহররমের এ দিনে মহান আল্লাহর রহমতে সুস্থতা লাভ করেন। ৬. হজরত ইয়াকুব (আ.) এর পুত্র হজরত ইউসুফ (আ.) তাঁর ১১ ভাইয়ের ষড়যন্ত্রে কূপে পতিত হন এবং এক বণিক দলের সহায়তায় মিসরে গিয়ে হাজির হন। তারপর মহান আল্লাহর বিশেষ কুদরতে তিনি মিসরের প্রধানমন্ত্রী হন। ৪০ বছর পর ১০ মহররম পিতার সঙ্গে মিলিত হন। ৭. হজরত ইউনুস (আ.) জাতির লোকদের প্রতি হতাশ হয়ে নদী অতিক্রম করে দেশান্তরিত হওয়ার সময় নদীর পানিতে পতিত হন এবং মাছ তাঁকে গিলে ফেলে। মাছের পেট থেকে তিনি মহান আল্লাহর রহমতে ৪০ দিন পর মুক্তি পান ১০ মহররম তারিখে। ৮. হজরত মুসা (আ.) ফেরাউনের অত্যাচারের কারণে তাঁর দলবলসহ অন্যত্র চলে যান। পথিমধ্যে নীল নদ পার হয়ে তিনি ফেরাউনের হাত থেকে আশুরার দিন মুক্তি পান। আর ফেরাউন তার দলবলসহ নীল নদের পানিতে ডুবে মারা যায়। ৯. হজরত ঈসা (আ.) এর জাতির লোকেরা তাঁকে হত্যা করার চেষ্টা করলে মহররমের ১০ তারিখ মহান আল্লাহ তাঁকে আসমানে উঠিয়ে নিয়ে মুক্তি দান করেন। ১০. মহররম মাসের ১০ তারিখ কারবালার বিয়োগান্ত ঘটনার অবতারণা হয়। এদিন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে ইমাম হোসাইন কারবালা প্রান্তরে শাহাদাতবরণ করেন।

আশুরার ইতিহাস

আশুরা ইতিহাসের এক বেদনা বিধুর ঘটনা। ৬৮০ খ্রিস্টাব্দের এ দিনে ইরাকের কারবালা প্রান্তে ফোরাতের তীরে বিশ্বের ইতিহাসের এক নির্মম হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়। এতে মহানবী (সা.) এর দৌহিত্র ইমাম হোসেন সপরিবার শাহাদাৎ বরণ করেন। কারবালার ঘটনা সংগটিত হওয়ার আগেই ইসলাম আশুরার গুরুত্ব দিয়েছে। এ কারণেই রমজান মাসের রোজার আগে মুসলমানদেরকে ফরজ হিসেবে এ দিনে রোজা রাখতে হয়েছে যা ইহুদি ধর্মের বিধানেও আছে। তবে কারবালার মর্মান্তিক হত্যাকান্ডের পর মুসলিম সমাজে আশুরা শোকাবহ দিন হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলির পর মুয়াবিয়া মুসলিম জাহানের আমির বা শাসক নিযুক্ত হন। আর হযরত আলি তনয় ও মহানবীর (সা.) দৌহিত্র ইমাম হোসেন চুক্তি অনুযায়ী মুয়াবিয়ার খেলাফতের উত্তরাধিকারী মনোনীত হন। কিন্তু আমিরে মুয়াবিয়ার ইন্তিকালের পর তার পুত্র ইয়াজিদ চুক্তি ভঙ্গ করে অন্যায়ভাবে খেলাফতের দায়িত্ব নেন এবং শাসন ব্যবস্থায় স্বৈরাচার নীতি অবলম্বন করেন। এতে মুসলিম জাহানে বিবাদ-বিশৃঙ্খলা বেড়ে যায়। ইয়াজিদ ক্ষমতা নিয়েই হায়েনার মতো জুলুমের হাত প্রসারিত করে। ফলে সর্বত্র বিদ্রোহ ও অশান্তির দাবানল দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। হোসাইন (রা.) ইয়াজিদের এই কুশাসন বরদাশত করলেন না। ফলে বেঁধে গেল মিথ্যা ও সত্যের দ্বন্দ্ব। ইতিমধ্যে ইয়াজিদ মদিনার গভর্নরের মাধ্যমে আদেশ পাঠালো হোসাইন (রা.) যেন ইয়াজিদের প্রতি বাইয়াত গ্রহণ করে। এই সংবাদ শুনে হোসাইন (রা.) মক্কায় হিজরত করেন। এদিকে কুফার একটি বড় জামাত ইয়াজিদের হাতে বাইয়াত গ্রহণ থেকে বিরত থাকল এবং তারা হোসাইন (রা.) এর হাতে বাইয়াত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। তারা হোসাইন (রা.) এর প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন এবং কুফায় যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে হোসাইন (রা.) এর কাছে দেড় শতাধিক চিঠি লিখল। তাদের চিঠি মোতাবেক হোসাইন (রা.) ৭২ জন নারী-পুরুষের এক কাফেলা নিয়ে মক্কা থেকে কুফার দিকে রওনা হন। যাত্রাপথে তিনি ফোরাত নদীর তীরে কারবালা নামক মরুভ‚মিতে ইয়াজিদ বাহিনী কর্তৃক ঘেরাও হন। হোসাইন (রা.) ইয়াজিদের সেনাবাহিনীকে অনেক অনুরোধ করলেও তারা ইয়াজিদের হাতে বাইয়াত গ্রহণ অথবা যুদ্ধ ছাড়া অন্য কিছু মানতে অস্বীকার করে। অবশেষে ৬১ হিজরির ১০ মহররম কারবালা প্রান্তরে ৪ হাজার ইয়াজিদ সৈন্যের মোকাবেলায় হোসাইন (রা.) এর নিঃস্ব ৭০ জনের কাফেলা ইয়াজিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য দাঁড়িয়ে যান। হোসাইন বাহিনীর সবাই বীর বিক্রমে যুদ্ধ করে দুশমনের মোকাবেলায় একে একে শাহাদাত বরণ করেন। এরপর হোসাইন (রা.) নিজেই ময়দানে আসেন এবং দীর্ঘক্ষণ শত্রুর মোকাবেলায় যুদ্ধ করতে করতে জমিনকে পবিত্র রক্তে রঞ্জিত করেন। একদিকে ক্ষমতায় মদমত্ত স্বৈরাচার ইয়াজিদ অন্যদিকে খেলাফতের ন্যায্য দাবিদার মহানবী (সা.) দৌহিত্র ইমাম হোসেন। অন্যায়-অসত্যের বিরুদ্ধে সত্য-ন্যায় প্রতিষ্ঠার লড়াই। স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে অধিকার আদায়ের খেলাফত প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। একদিকে ইয়াজিদের বিপুল সমরাস্ত্র অন্যদিকে ইমাম হোসেন নিরস্ত্র। অধিকন্তু ইয়াজিদের সৈন্যদের দ্বারা ফোরাতের তীরও অবরুদ্ধ। ইমাম হোসেন ও তার সৈনিকেরা তৃষ্ণায় কাতর। এমতাবস্থায় ইমাম হোসেনকে আত্মসমর্পণের জন্য ইয়াজিদ প্রস্তাব পাঠান। কিন্তু ইয়াজিদের অন্যায়-অসত্য ও স্বৈরাচারী শক্তির কাছে মাথা নত না করে তিনি যুদ্ধ চালিয়ে যান। এ অসম যুদ্ধে স্বভাবতই ইমাম হোসেন পরাজিত হন। আর বিজয়ী ইয়াজিদ পাশবিক উম্মাদনায় মেতে উঠেন। তিনি পরাজিত ইমাম হোসেন ও তার পরিবারের সদস্যদের নির্মমভাবে হত্যা করেন। সাধারণভাবে যুদ্ধে বিজয়ী প্রশংসিত কিন্তু কারবালা যুদ্ধের ইতিহাস ভিন্ন। ন্যায়-অন্যায় বিবেচনায় কারবালা যুদ্ধের বিজিত নন্দিত অন্যদিকে বিজয়ী ঘৃণিত। নৃশংসতা-নির্মমতার কারণে ইয়াজিদ নিন্দনীয়। আর ইমাম হোসেন পরাজিত হয়েও ইতিহাসে স্মরণীয়। অন্যায়-অসত্যের কাছে মাথা নত না করার জন্য তিনি বিশ্ব বরণীয়। সত্য-ন্যায়ের ঝান্ডা সমুন্নত রাখার জন্য তার আদর্শ অনুকরণীয়।

আশুরার রোজা

মহররম মাসে রোজা রাখা সম্পর্কে অনেক বিশুদ্ধ হাদিস বর্ণিত হয়েছে। বিশেষভাবে আশুরা, অর্থাৎ মহররমের ১০ তারিখে রোজা রাখার ফজিলত সম্পর্কে অনেক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। একটি হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয়, রমজান মাসের রোজা ফরজ হওয়ার আগে আশুরার রোজা উম্মতে মুহাম্মদীর ওপর ফরজ ছিল। পরবর্তী সময়ে অবশ্যই ওই বিধান রহিত হয়ে যায় এবং তা নফলে পরিণত হয়। হজরত জাবের (রা.) সূত্রে বর্ণিত আছে মহানবী (সা.) আমাদের আশুরার রোজা রাখার নির্দেশ দিতেন এবং এর প্রতি উৎসাহিত করতেন। এ বিষয়ে নিয়মিত তিনি আমাদের খবরাখবর নিতেন। যখন রমজানের রোজা ফরজ করা হলো, তখন আশুরার রোজার ব্যাপারে তিনি আমাদের নির্দেশও দিতেন না এবং নিষেধও করতেন না। আর এ বিষয়ে তিনি আমাদের খবরাখবরও নিতেন না (মুসলিম ১১২৮)। ওই হাদিসের আলোকে আশুরার রোজার শ্রেষ্ঠত্ব প্রতীয়মান হয়। এমনকি ওই সময়ে তা ফরজ ছিল। বর্তমানে এই রোজা যদিও নফল, কিন্তু অন্যান্য নফল রোজার তুলনায় অধিক গুরুত্বপূর্ণ। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসুল (সা.) আশুরা ও রমজানের রোজা সম্পর্কে যেরূপ গুরুত্ব প্রদান করতেন, অন্য কোনো রোজা সম্পর্কে সেরূপ গুরুত্বারোপ করতেন না (বুখারি ও মুসলিম)। হজরত হাফসা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, মহানবী (সা.) চারটি কাজ কখনো ছেড়ে দিতেন না। তার মধ্যে একটি আশুরার রোজা (নাসায়ি)। হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.) বর্ণনা করেন, আশুরার দিন ইহুদিরা ঈদ পালন করত। মহানবী (সা.) সাহাবিদের সেদিন রোজা রাখতে নির্দেশ দিলেন (বুখারি-২০০৫, মুসলিম-১১৩১)। হজরত ইবনে ওমর (রা.) সূত্রে বর্ণিত, জাহিলিয়াতের যুগে কাফেররা আশুরার দিন রোজা রাখত। তাই মহানবী (সা.) ও সাহাবায়েকেরামও সেদিন রোজা রাখতেন কিন্তু যখন রমজানের রোজা ফরজ হয়, তখন তাঁদের রোজা রাখা না রাখার ব্যাপারে স্বাধীনতা প্রদান করা হয় (মুসলিম-১১৩৬)। হজরত আয়েশা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, কাফেররা অন্ধকার যুগে আশুরার দিন রোজা রাখত কারণ তারা প্রতিবছর মহররমের ১০ তারিখে কাবা শরিফকে গেলাফ পরিধান করাত (বুখারি : ১৫৮২)। তারা গেলাপ পরিধান করানোর জন্য ওই দিনকে কেন নির্দিষ্ট করেছিল? এ প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে বিখ্যাত তাবেয়ি হজরত ইকরামা (রা.) বলেন অন্ধকার যুগে কাফেররা একটি বড় অপরাধ (তাদের দৃষ্টিতে) করে বসে। তাদের বলা হলো, তোমরা আশুরার দিন রোজা রাখো, তাহলে তোমাদের গুনাহ মাফ হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তখন থেকে কোরাইশ বংশের লোকেরা সেদিন রোজা রাখতে শুরু করে (ফতহুল বারি খ.-৪ পৃ.-৭৭৩)। মহানবী (সা.) এই রোজা নিজে পালন করেছেন এবং উম্মতকে রাখার প্রতি উৎসাহিত করেছেন। তাই এর পূর্ণ অনুসরণ ও আনুগত্যের মধ্যেই নিহিত রয়েছে উম্মতের কল্যাণ। এ ছাড়া অসংখ্য হাদিসে আশুরার রোজার ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। হজরত আবু কাতাদা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুল (সা.) কে আশুরার রোজার ফজিলত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, এই রোজা বিগত বছরের গুনাহ মুছে দেয় (মুসলিম-১১৬২)। রাসুল (সা.) বলেন রমজান মাসের রোজার পর সর্বোত্তম রোজা মহররমের আশুরার রোজা (সুনানে কুবরা-৪২১০)। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত মহানবী (সা.) যখন আশুরার দিনে রোজা রাখেন এবং অন্যদেরও রোজা রাখার নির্দেশ প্রদান করেন, তখন সাহাবিরা অবাক হয়ে বলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! ইহুদি-নাসারারা তো এই দিনটিকে বড়দিন মনে করে। আমরা যদি এই দিনে রোজা রাখি, তাহলে তো তাদের সঙ্গে সামঞ্জস্য হবে। তাদের প্রশ্নের উত্তরে রাসুল (সা.) বললেন, তারা যেহেতু এদিন একটি রোজা পালন করে, আগামী বছর ইনশাআল্লাহ আমরা এই ১০ তারিখের সঙ্গে ৯ তারিখ মিলিয়ে দুই দিন রোজা পালন করব (মুসলিম-১১৩৪)। অতএব যদি কেউ ওই দিন উন্নত খানাপিনার ব্যবস্থা করে, তাহলে শরিয়তে নিষেধ নেই। তবে স্মরণ রাখতে হবে, কোনোক্রমেই যেন তা বাড়াবাড়ি ও সীমালংঘনের স্তরে না পৌঁছে।

আশুরার দিন যা বর্জনীয়

সুন্নি নামধারী কিছু লোক এদিন নানা জাতের খানাপিনা করেন, মহরম এর বাদ্য বাজান, এদিনটাকে খুশীর আমেজে পালন করেন। আবার শীয়া নামধারী কিছু লোক এদিন নানা জাতের মাতম করেন, বুকে পিঠে ছুরি মারেন, তাজিয়া মিছিল করেন। এসব কাজ অবশ্যই বর্জনীয়। এসব কখনোই ইসলাম অনুমোদন করেনি। কাজেই এগুলো বিদআত। এদের কিছু কিছু কর্মকান্ড শির্কের পর্যায়ভুক্ত। মুসলমানদেরকে অবশ্যই এসব বর্জন করতে হবে।

যা করণীয়

 রোজা রাখা। কেননা কারবালার এই মর্মান্তিক ঘটনা ছাড়াও এদিনটি ইসলামে গুরুত্বপূর্ণ। আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেন, রামাযানের পর সর্বোত্তম রোযা হল মুহাররামের রোযা। আর ফরয নামাযের পর সর্বোত্তম নামায হল রাতের নামায (মুসলিম)। ইবন আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, মহানবী (সা.) কে এই আশুরার দিনের উপর অগ্রাধিকার দিয়ে এত গুরুত্বসহকারে অন্য কোন দিন রোযা পালন করতে দেখিনি (অর্থাৎ রামাযান মাস ছাড়া) (বুখারী)।

 কারবালার এ বিয়োগান্ত ঘটনা স্মরণ করে ইমাম হুসাইন (রাঃ) ও তার পরিবার বর্গের জন্যে দোয়া করা। মহান আল্লাহ বলেছেন, যাঁরা মহান আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হন তাঁদেরকে কখনও মৃত মনে করো না। বরং তাঁরা নিজেদের রব তায়ালার নিকট জীবিত ও রিযিকপ্রাপ্ত (সূরা আলে ইমরান-১৬৯)।

 কারবালার ঘটনার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে রাজতন্ত্র, পরিবারতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, পীরবাদ, জালিম শাসক ও শোষকদের বিরুদ্ধে মনেপ্রাণে ঘৃণা প্রকাশ করা, কবির এ অমর বাণীটা স্মরণ রাখা, ইসলাম জিন্দা হোতা হ্যায় হর কারবালা কি বাদ।

কারবালার নিষ্ঠুর হত্যাকান্ডের প্রায় ১৪শত বছর অতিক্রান্ত হলেও আজও ইমাম হোসেন সমগ্র মুসলমান জাতির অন্তরে স্মৃতিময় হয়ে আছেন। একইভাবে ইয়াজিদের প্রেতাত্মাও বিদ্যমান আছে। তাই সময়-স্থানের ব্যাপক ব্যবধান সত্তে¡ও কারবালার প্রেক্ষাপট আর আজকের প্রেক্ষাপট প্রায় অভিন্ন। কারণ সত্য-মিথ্যার চিরন্তন দ্বন্দ্ব । এ দ্বন্দ্বে সত্যপস্থী ও ন্যায়বাদীদের ত্যাগ করতেই হবে। তবেই কারবালার শহীদদের প্রতি যথার্থ সম্মান দেখানো হবে। প্রকৃতপক্ষে মুসলিমগণের এক তাৎপর্যময় দিন পবিত্র আশুরা। এ দিনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য কারবালার বিষাদময় ঘটনা। এতে লুকিয়ে আছে ত্যাগের মহিমা আর সত্য-ন্যায় প্রতিষ্ঠার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা। তাই শুধু মর্সিয়া-মাতম নয় বরং ত্যাগ-কুরবানি আশুরার প্রধান শিক্ষা। আশুরা বারে বারে আসে মুসলিম জাতির হৃত ঐতিহ্য শিক্ষা-সংস্কৃতি অনুপ্রেরণা জোগাতে। আশুরা আসে সমাজদেহে বিরাজিত নৃশংসতা মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধে কারবালার ত্যাগের শিক্ষা, অন্যায়ের কাছে মাথানত না করার শিক্ষা আমাদের চিরন্তন আদর্শ ও অনুপ্রেরণা হওয়া উচিত। তাই মর্সিয়া ক্রন্দন নয়, কারবালার বাস্তব শিক্ষা, অর্থাৎ সত্যের জন্য আত্মত্যাগের যে অতুলনীয় শিক্ষা, তা সাদরে গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়, ফিরে এলো আজ সেই মহররম মাহিনা/ ত্যাগ চাই, মর্সিয়া ক্রন্দন চাহি না আসুন, পবিত্র মহররম মাস আশুরার দিনে (১০ মহররমের আগে বা পরে এক দিনসহ) আমরা রোজা রেখে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে কল্যাণ লাভ করার সুযোগ গ্রহণ করি। বেশি বেশি তাওবা-ইস্তেগফার ও দান-খয়রাত করে গুনাহ থেকে মাফ পাওয়ার চেষ্টা করি। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মহররম ও আশুরা থেকে আমাদের অফুরন্ত ফজিলত দান করুন। আমিন!

লেখকঃ মোঃ কামাল উদ্দিন, প্রভাষক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, আতাকরা কলেজ, কুমিল্লা।

এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2020