1. [email protected] : thebanglatribune :
সাদাকাতুল ফিতর রোজাকে ত্রুটি মুক্ত করে - The Bangla Tribune
এপ্রিল ১২, ২০২৪ | ৮:৫৯ অপরাহ্ণ

সাদাকাতুল ফিতর রোজাকে ত্রুটি মুক্ত করে

  • প্রকাশের সময় : বুধবার, এপ্রিল ১২, ২০২৩

ফিতরা আরবি শব্দ অর্থ ভাঙ্গা বা ভঙ্গ করা। রোজার সমাপনের দিন বা উপবাস ভঙ্গের দিন সকালে সদকা (দান) দেয়া হয় বলে এর নাম ফিতরা। সাদাকাতুল ফিতর বলতে ঈদুল ফিতর উপলক্ষে হতদরিদ্র গরিব দুঃস্থদের মাঝে রোজাদারদের বিতরণ করা দানকেই বুঝানো হয়।

সাদাকাতুল ফিতর পাওয়ার উপযুক্ত তারাই, যারা যাকাত পাওয়ার উপযুক্ত। যেমন ১. দরিদ্র, ২. ঋণ আদায়ে অক্ষম ৩. যে ব্যক্তি ঋণগ্রস্থ তাকে প্রয়োজন পরিমাণ দেয়া যাবে। ‘সাদাকাতুল ফিতর অনেক ফকিরকে দেয়া যাবে এবং অনেক সাদাকাতুল ফিতর এক মিসকিনকেও দেয়া যাবে’ দুররে মুখতার: ২/৩৬৭। তবে সমাজের দরিদ্র-অনাথ ও নিজের গরিব আত্মীয় ও প্রতিবেশীকে দেয়াটাই অধিক উত্তম। কেননা হাদীসে সাদাকাতুল ফিতর আদায়ের উদ্দেশ্য সম্পর্কে দরিদ্রের খাবারের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে। রাসূল (সা.) ও সাহাবায়ে কেরাম সাদাকাতুল ফিতরের এক সা’ পরিমাণ আদায় করেছেন। আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমরা সাদাকাতুল ফিতর আদায় করতাম এক ‘সা’ খানা, অথবা এক ‘সা’ গম, অথবা এক ‘সা’ খেজুর, অথবা এক ‘সা’ পনির, অথবা এক ‘সা’ কিশমিশ দ্বারা। ’ অন্য হাদিসে আছে, আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, ‘রাসূল (সা.) এর সময় আমরা সাদাকাতুল ফিতর দিতাম এক সা’ খাদ্যবস্তু, তিনি বলেন, তখন আমাদের খাদ্য ছিল যব (বার্লি), কিশমিশ-মোনাক্কা, পনির ও খেজুর’ সহিহ বোখারি: ১/২০৪-২০৫।

বর্ণিত এ দু’টি হাদিস থেকে বোঝা যায়, কোনো খাদ্যবস্তু দ্বারা সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা যাবে এবং এর পরিমাণ হলো এক সা’। যার বর্তমান বাজারমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে জনপ্রতি সর্বনিম্ন ৭৫ টাকা, সর্বোচ্চ ২৩১০ টাকা।

ইসলামি শরিয়া মতে আটা, খেজুর, কিসমিস, পনির ও যব ইত্যাদি পণ্যগুলোর যে কোনো একটির মাধ্যমে ফিতরা প্রদান করা যায়। আটার মাধ্যমে ফিতরা আদায় করলে জনপ্রতি এক কেজি ৬৫০ গ্রাম বা এর বাজার মূল্য আদায় করতে হবে। খেজুরের মাধ্যমে আদায় করলে ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম বা এর বাজার মূল্য, কিসমিসের মাধ্যমে আদায় করলে ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম বা এর বাজার মূল্য, পনির দিয়ে আদায় করলে ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম বা এর বাজার মূল্য এবং যব দিয়ে আদায় করলে ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম বা এর বাজার মূল্য দিয়ে ফিতরা আদায় করতে হবে।

সাদাকাতুল ফিতর আদায়ের সময় দু’ধরনের- ১. ফজিলতপূর্ণ সময়: ঈদের দিন সকালে ঈদের নামাজের পূর্বে। সহিহ বুখারি বর্ণিত, আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বলেন, আমরা রাসূল (সা.) এর যুগে সাদাকাতুল ফিতর হিসেবে ঈদুল ফিতরের দিন এক সা’ পরিমাণ খাদ্য আদায় করতাম। হজরত ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) ঈদের নামাজ পড়তে যাওয়ার পূর্বে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করার আদেশ দিয়েছে। সুতরাং ঈদুল ফিতরের নামাজ একটু বিলম্বে আদায় করা উত্তম। যাতে মানুষ সাদাকাতুল ফিতর আদায় করতে পারে। ২. জায়েজ সময়: ঈদের একদিন দু’দিন পূর্বে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা। তখন তা ওয়াজিব হিসেবেই আদায় হয়ে যাবে। তবে ঈদের দিন ঈদের নামাজের পূর্বেই আদায় করা মোস্তাহাব।

যদি কোনো কারণবশতঃ ঈদের নামাজের পূর্বে আদায় করতে না পারে তাহলে পরে হলেও আদায় করা ওয়াজিব; এটা কখনো নফলে পরিণত হবে না হেদায়া: ১/২০৮। ঈদের কতদিন পূর্বে ফিতরা আদায় করা যাবে? এ বিষয়ে ইসলামি আইন বিশারদগণের মতভেদ থাকলেও গ্রহণযোগ্য মত হচ্ছে, রমজানের পূর্বে আদায় করলেও ফিতরা আদায় হয়ে যাবে। এমনকি কয়েক বছরের ফিতরা একত্রে আদায় করলেও তা আদায় হবে’ ফাতাওয়ায়ে শামি: ২/৩৬৭। সাদাকাতুল ফিতর প্রদানের সময় যে এলাকায় সে অবস্থান করছে ওই এলাকার গরিবরাই বেশি হকদার। ওই এলাকায় সে স্থায়ী হোক বা অস্থায়ী। কিন্তু যদি তার বসতি এলাকায় কোনো হকদার না থাকে বা হকদার চেনা অসম্ভব হয়, তাহলে তার পক্ষে উকিল নিযুক্ত করবে। সে উপযুক্ত ব্যক্তি খুঁজে তার সাদাকাতুল ফিতর আদায় করে দিবে। ইবনে ওমর (রা.) বলেন, ‘রাসুল (সা.) মুসলিমদের স্বাধীন ও ক্রীতদাস পুরুষ ও নারী এবং ছোট ও বড় সবার জন্য এক সা’ (প্রায় সাড়ে ৩ কেজি) খেজুর বা যব খাদ্য (আদায়) ফরজ করেছেন (বুখারি, মুসলিম)। সাদাকাতুল ফিতর দ্বারা কুরআনুল কারিমে অনাকাঙ্খিত ত্রুটি-বিচ্যুতির পরিশুদ্ধ হওয়ার কথা বুঝানো হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন-‘নিশ্চয় সাফল্য লাভ করবে সে, যে পরিশুদ্ধ হয় (সুরা আলা : আয়াত ১৪)।

তাফসিরকারকগণের মতে, এ পরিশুদ্ধ দ্বারা সাদাকাতুল ফিতরকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে। অর্থাৎ যারা সাদকায়ে ফিতর আদায় করবেন তারাই লাভ করবেন সফলতা লাভ করবেন এবং রোজায় অনাকাঙ্খিত ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে মুক্তি লাভ করবেন। সাদকায়ে ফিতর আদায় করা মুমিনের জন্য মহান আল্লাহ কর্তৃক অত্যাবশ্যকীয় বিধান। হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী- ‘তুহরাতুল্লিস সায়িম’ অর্থাৎ একমাস সিয়াম সাধনায় মুমিনের অনাকাঙ্খিত ত্রুটি-বিচ্যুতির কাফফারা হলো সাদকায়ে ফিতর। হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী- ‘তুমাতুল্লিলমাসাকিন’ অর্থাৎ সমাজের অসহায়, দুঃস্থ-দরিদ্র রিক্তহস্ত জনগোষ্ঠি যাতে বছরান্তে একটি দিন অন্তত খেয়ে-পরে আনন্দ উদযাপন করতে পারে। এবং দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পরে আল্লাহ তাআলা কর্তৃক পানাহারের অনুমতি পাওয়ায় তাঁর কৃতজ্ঞতা স্বরূপ সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা হয়। অতএব সাদাকাতুল ফিতর একমাত্র দরিদ্র-অনাথকে দিয়ে ঈদের আনন্দে তাদের শামিল করবে ও নিজের রোজাকে ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে পরিচ্ছন্ন করবে- এটাই হবে সাদাকাতুল ফিতরের লক্ষ্য। আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে সাদকায়ে ফিতরের গুরুত্ব অনুধাবন করে রমজানের রোজার ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে মুক্তি দিয়ে এর গুরুত্ব ও ফজিলত লাভ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক: মোঃ কামাল উদ্দিন, প্রভাষক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, আতাকরা কলেজ, কুমিল্লা।

এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2020