ডাকটিকিটের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও সৈয়দ আহম্মেদ যায়েদ-এর ডাকটিকিট বই নিয়ে পর্যালোচনা -মোঃ হাবিবুর রহমান

কলাম জাতীয়

ভাবের আদান প্রদান করতে মানুষ বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে আসছে। কখনো সাক্ষাতে, কখনো কাছে, কখনো দূরে , আবার কখনো কিংবা অনুপস্থিতিতে। প্রিয়জন ও কাছের মানুষের কাছে ভাবের আদান প্রদান করা প্রাচীনকালে অনেক কঠিন ছিলো। বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম গীতিকবি মনিরুজ্জামান মনির এর জনপ্রিয় গানেও সে বিষয়ের প্রতিধ্বনিও হয়েছে। তিনি লিখছিলেন, নাই টেলিফোন নাইরে পিয়ন নাইরে টেলিগ্রাম , বন্ধুর কাছে মনের খবর কেমনে পৌঁছাইতাম। সময়ের পরিক্রমায় মনের আকুতি ও অনুভূতি শেয়ার করার জন্য চিঠির আদান প্রদানের প্রচলন শুরু হয়। সেজন্য ডাকটিকিট ব্যবহার শুরু হয়। চিঠিতে ব্যবহার ছাড়াও ডাকটিকিট বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যবহৃত হয়। তথ্য ও প্রযুক্তির উন্নতির ফলে চিঠির ব্যবহার ও রীতি নীতি কমে গেলেও ডাকটিকিট এর ব্যবহার ও প্রচলন আজও ফুরিয়ে যায়নি। দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, গুণীজনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, সংস্কৃতি লালন ও বিভিন্ন কারণে ডাকটিকিট-এর ব্যবহার এখনও চলমান রয়েছে। এছাড়াও অনেকে শখের বশে আবার অনেকে গবেষণা ও ইতিহাস চর্চা করার জন্য ডাকটিকিট সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে থাকে। যা আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম ও আজকের প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয়।

 

স্ট্যাম্প গবেষক, ডাকটিকিট এর এক সুদীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। স্ট্যাম্প গবেষক এবং সংগ্রাহকদের অফিসিয়াল নাম মূলত ফিলাটেলিস্ট। ব্যক্তি মূলত তার পছন্দের ফোকাসকে কেন্দ্র করে ডাকটিকিট সংগ্রহ করেন। তা গাড়ি বা পাখি বা অন্য কিছু হতে পারে। এইভাবে স্ট্যাম্পগুলি তার সমস্ত সূক্ষ্মতার মধ্যে একটি বৃহৎ বিষয় সম্পর্কে শেখার জন্য একটি বাহন হয়ে উঠে। ডমিনিক সাভাস্তানো বলেছেন, স্পিঙ্ক লন্ডনের স্ট্যাম্প বিশেষজ্ঞ। “জ্ঞান দিয়ে আপনি ডিলারদের পরাজিত করতে পারেন। পুরানো স্ট্যাম্পগুলি সাধারণত আধুনিক স্ট্যাম্পের চেয়ে বেশি মূল্যবান, সাভাস্তানো বলেছিলেন। বেশিরভাগ আধুনিক “বিশেষ” এবং “স্মারক” সেটগুলি প্রচার এবং অর্থনৈতিক কারণে দেশগুলি দ্বারা প্রকাশিত হয় যেহেতু অনেকগুলি মুদ্রিত হয় তার মূল্য নেই।

 

রোল্যান্ড হিল ছিলেন একজন প্রাক্তন স্কুলমাস্টার। যিনি ১৮৩০-এর দশকে পোস্ট অফিসের একমাত্র অভিজ্ঞতা ছিল একজন অসন্তুষ্ট ব্যবহারকারী হিসেবে। অনেকে মনে করেন, সস্তা পোস্টেজ বিশ্বকে কিছু স্বীকৃত আধুনিক সমস্যা নিয়ে এসেছে। জাঙ্ক মেইল, স্ক্যাম এবং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার জন্য ক্রমবর্ধমান চাহিদা উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত। হিলের পেনি পোস্ট থেকে অর্ধশতক আগে, লন্ডনে ডেলিভারি প্রতি ঘণ্টার মতো ঘন ঘন ছিল, এবং “ডাক ফেরত” দ্বারা উত্তর প্রত্যাশিত ছিল।

 

একদল অর্থনীতিবিদ সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই ধারণার একটি উদ্ভাবনী পরীক্ষা নিয়ে এসেছেন। তারা পোস্ট অফিসের বিস্তারের তথ্য সংগ্রহ করেছে। সুইজারল্যান্ড এবং ব্রাজিলে ডাকটিকিট চালু করতে মাত্র তিন বছর সময় লেগেছিল। বিপরীত দিকে আমেরিকায় একটু বেশি সময় লেগেছিল এবং ১৮৬০ সালের মধ্যে পৃথিবীতে ৯০টি দেশে ছিল। হিল দেখিয়েছিল যে পিরামিডের নীচের ভাগ্য সেখানে খনন করার জন্য ছিল।

১৮০ বছরেরও বেশি আগে ডাকটিকিটের উদ্ভাবন মানুষের চিঠি পাঠানো এবং গ্রহণ করার পদ্ধতিকে পরিবর্তন করেছিল। এখন তাদের ডিজিটাল যুগে আনা হচ্ছে, প্রতিদিনের রয়্যাল মেইল স্ট্যাম্পে বারকোড যুক্ত করা হচ্ছে। বর্তমানে এ ব্যবস্থায় অনেক পরিবর্তন এসছে।

 

১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ে, রোল্যান্ড হিল নামে একজন ব্যক্তি ব্রিটেনের ডাক পরিষেবা কীভাবে কাজ করে, তাতে বিরক্ত হয়েছিলেন এবং নিজের একটি নতুন ব্যবস্থা নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেন।

 

একটি ব্রিটিশ পোস্ট অফিসে একটি সাধারণ ভ্রমণ একজন ভাগ্যবান স্ট্যাম্প সংগ্রাহকের জন্য একটি জীবন-পরিবর্তনকারী অ্যাডভেঞ্চারে পরিণত হয়েছিল। বর্তমানে অনেক দেশে এটা সংগ্রহের রীতি রয়েছে।

 

১৯৬৭ সালে, একজন স্ট্যাম্প উৎসাহী গ্রেট ব্রিটেনের এক জোড়া স্ট্যাম্প কিনতে উত্তর ইংল্যান্ডের রচডেলে তার স্থানীয় পোস্ট অফিসে যান। টেলিভিশনের উদ্ভাবন উদযাপনকারী এবং রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের একটি সিলুয়েট দেখানো একটি জুটির জন্য তিনি এক শিলিং এবং নয় পেন্স (১০ ইউএস সেন্টের কম) প্রদান করেছিলেন। পরে তিনি যা বুঝতে পারেননি তা হল যে স্ট্যাম্পগুলির মধ্যে একটি রানীর মাথা অনুপস্থিত ছিল। এটি একটি ভাগ্যবান ক্রয় ছিল। ২০১৪ সালে, তিনি SG ৭৫৫b নামে পরিচিত স্ট্যাম্পটি নিলামে £২৩,৬০০ ($৩৬,২৬০) বিক্রি করেছিলেন।

 

যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ইমেলের আবির্ভাব পোস্টাল মেল পরিষেবাকে ক্ষতিগ্রস্থ করেছে। স্ট্যাম্প সংগ্রহ অনেক দেশে একটি মূল্যবান ব্যবসা এবং বিনিয়োগ কৌশল হিসাবে একটি উৎসাহী শখ হিসাবে রয়ে গেছে। ১৮৪০ সালে বিশ্বের প্রথম আঠালো স্ট্যাম্প, ব্রিটিশ পেনি ব্ল্যাক-এর পর থেকে বিলিয়ন স্ট্যাম্প জারি করা হয়েছে। অনেকগুলিই রোমান্স এবং বিদ্যার দ্বারা সজ্জিত – সংগ্রাহকদেরকে বিদেশী গন্তব্যে নিয়ে যাওয়া, ইতিহাসের সংকটময় মুহূর্ত এবং কারো জন্য, ভবিষ্যতের ভাগ্যের অধরা।

 

২০১৪ সালে, এক-সেন্ট ম্যাজেন্টা – ১৮৫৬ সালে ব্রিটিশ গায়ানায় হাতে লেখা কালো স্ক্রিপ্ট সহ একটি নিরবচ্ছিন্ন ম্যাজেন্টা অষ্টভুজ – একটি ডাকটিকিটের জন্য সবচেয়ে বেশি অর্থ প্রদানের রেকর্ড স্থাপন করেছিল৷ সমষ্টি ছিল $৯.৫ মিলিয়ন, এটির মূল পেনি মূল্যের প্রায় এক বিলিয়ন গুণ। যদিও অসংখ্য সংগ্রাহকের গভীর পকেট এবং কয়েক দশকের জ্ঞান রয়েছে। যে কেউ একজন বিরল স্ট্যাম্পের অনুরাগী হয়ে উঠতে পারে।

 

বাংলাদেশে ডাকটিকিট নিয়ে গবেষণা ও বই ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে।  সৈয়দ আহম্মেদ যায়েদ লিখিত ডাকটিকিট বাংলাদেশের মুখচ্ছবি বই (অক প্রকাশনী, জানুয়ারি, ২০২০) বাংলাদেশে ডাকটিকিট এর ইতিহাস ও বিস্তারিত বর্ণনা তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর এ বইটি ক্ষুদে পাঠক ও পাঠিকার জন্যে রচিত হলেও সব বয়সী পাঠক-পাঠিকার জ্ঞানের খোরাক জোগাবে আমি মনে করি। এ বইতে তিনি মূলত ডাকটিকিটের প্রদর্শনের মাধ্যমে, বাংলাদেশের বিভিন্ন বিষয়াবলী তুলে ধরেছেন। এ ব্ইয়ে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীন বাংলাদেশ, মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রণীত ডাকটিকিট,  বিভিন্ন মনীষী ও গুণীজন, মানচিত্র, জাতীয় পতাকা, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, দেশীয় পোশাক, নৃ-গোষ্ঠী, কৃষি, ফুল, ফল, পাখি, কীট পতঙ্গ,  মাছ, প্রাণী, সুন্দরবন, খেলাধুলা, উৎসব, লোক সংস্কৃতি, কুটির শিল্প, চিত্রকলা, স্মৃতিস্তম্ভ ও ভাস্কৃর্য, পর্যটন, বাহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ইত্যাদি বিষয়ের ডাকটিকিট তুলে ধরেছেন। এছাড়াও সম্প্রতি তাঁর লিখিত অনুচ্ছেদে ডাকটিকিটে বেগম রোকেয়া ( রোকেয়া পাঠ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর, ২০২২) ডাকটিকিটে বেগম রোকেয়া সম্পর্কে জানতে সহায়তা করবে।

 

সৈয়দ আহম্মেদ যায়েদ-এর লিখিত ডাকটিকিট বইটি তরুণ প্রজন্মের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। আগামী প্রজন্ম এ থেকে অনেক উপকৃত হবে। অনেক শুভ কামনা থাকলো এ লেখকের জন্য।

 

লেখক,

মোঃ হাবিবুর রহমান

গবেষক, কবি ও লেখক, ই-মেইল: mirmohammadhabib@gmail.com

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *