আখেরি চাহার শোম্বার এর মর্যাদা ও শরীয়তের দৃষ্টিভঙ্গিঃ মোঃ কামাল উদ্দিন

ধর্ম

আখেরী চাহার শোম্বা আরবী ও ফার্সি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। আখেরী আরবী শব্দ যার অর্থ “শেষ” এবং চাহার শোম্বা ফার্সি শব্দ যার অর্থ “বুধবার”। ওফাতের অসুস্থতা শুরু হওয়ার পর রাসুল (সা.) সাময়িক সুস্থতা লাভ করেন। কিছু সময় পর আবার হযরত অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং এর কয়েকদিন পর তিনি ইন্তেকাল করেন। রাসুল (সা.) এর অসুস্থতা ছিলো নিদারুণ যন্ত্রণার। আয়শা (রা.) বলেন, অসুখে এত বেশি কষ্ট পেতে আমার জীবনে আগে পরে রাসুল (সা.) কে দেখিনি।

রাসুল (সা.) এর অসুখের শুরু হয় মাথা ব্যথা থেকে। হজরত আয়শা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, একদিন রাতে রাসুল (সা.) কবর জিয়ারতের জন্য বের হলেন। আমিও তাঁর পেছন পেছন গেলাম। আমার সন্দেহ হলো, তিনি বোধহয় আমার হক অন্য কাউকে দিয়ে দেবেন। কিন্তু না, তিনি দীর্ঘ সময় কবরবাসীর জন্য দোয়া করলেন। রাসুল (সা.) যখন ঘরে ফিরে এলেন আমিও ঘরে ফিরে এলাম। আমি চাইছিলাম, তাঁকে অনুসরণ করার বিষয়টি যেনো তিনি বুঝতে না পারেন। কিন্তু আমাকে হাঁপাতে দেখে ঠিকই বুঝে ফেললেন। তিনি আমাকে বললেন, আয়শা! তোমার সন্দেহ ভুল ছিলো। ঠিক এমন সময়ই রাসুল (সা.) এর মাথা ব্যথা শুরু হয়।প্রচন্ড মাথা ব্যথা তার ওপর ভীষণ জ্বর নিয়ে রাসুল (সা.) যন্ত্রণায় ছটফট করতে লাগলেন। তিনি বারবার বলছিলেন, এ আমার শেষ যাত্রার অসুখ। আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবীগণের সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন, তাই তাদেরকে তিনি সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় করেন।

তবে অন্যসব নবী যত কষ্ট পেয়েছেন আমি তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি কষ্ট পাচ্ছি। সবাই ধরেই নিয়েছে এবার আর তিনি সুস্থ হবেন না। কিন্তু সফর মাসের শেষ বুধবার হঠাৎ রাসুল (সা.) সুস্থ হয়ে ওঠলেন। ইতিহাস থেকে জানা যায়, একদিন তিনি অনেকটা সুস্থতা বোধ করেন। পরে গোসল করেন এবং মসজিদে নববীতে ইমামতি করেন। এরপর তিনি আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন। অনেকদিন পর তাকে সুস্থ্য অবস্থায় দেখে সাহাবিগণ খুবই আনন্দিত হন। এসব দেখে সাহাবিগণ (রা.) যেনো আকাশের চাঁদ হাতে পেলেন। খুশিতে আনন্দে আত্মহারা হয়ে আল্লাহ তাআলার রাস্তায় স্বর্ণ-রূপা-নগদ অর্থ-উট-ভেড়া অকাতরে বিলিয়ে দিতে লাগলেন। সিরাতবিদগণ বলেন, রাসুল (সা.) এর সুস্থতায় খুশি হয়ে আবু বকর পাঁচ হাজার, ওমর সাত হাজার, আলী তিন হাজার দেরহাম এবং আবদুর রহমান বিন আওফ একশ উট আল্লাহ তাআলার জন্য দান করলেন। অবশ্য বিকেলের দিকেই হযরত আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং অল্প কিছুদিন পর তিনি ইন্তেকাল করেন। পরবর্তীতে রাসুল (সা.) এর প্রতি ভালোবাসা থেকে এইদিনটি মুসলমানদের কাছে আনন্দের দিন হিসেবে পালিত হতে থাকে। তবে মুসলিম বিশ্বের অনেক দেশে এ দিনটি বিশেষভাবে পালিত হয় না। ঐতিহাসিগণ এ দিন সম্পর্কে বিভিন্ন মতামত পেশ করেন।

কেউ কেউ বলেন, আখেরি চাহার শোম্বা ছিলো রাসুল (সা.) এর ইন্তেকালের পাঁচদিন আগে। তারা বলেন, এইদিন তাঁর অসুখ আরো বেড়ে যায়। তাঁর নির্দেশ মতে, সাত কূপের সাত মশক পানি দিয়ে তিনি গোসল করেন। এরপর কিছুটা সুস্থ্যবোধ করেন। তারপর ইমামতিতে যান। এক বর্ণনায় এসেছে, এ দিন রাসুল (সা.) যখন মসজিদে নববীতে গেলেন। তখন তাঁর শরীরের উন্নতি দেখে সাহাবাগণ খুবই আনন্দিত হলেন। অনেক বর্ণনায় বলা হয়, আনন্দে সাহাবাগণ নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী দান খয়রাত করতে থাকেন। আল্লাহ তাআলার হাবীবের সকল কাজের সাথেই তো মুমিন মুসলমানের বিশেষ মুহাব্বাতের সম্পর্ক । এ জন্য দিনটাকে মুসলমানরা একটা বরকতের দিন মনে করে। কিন্তু এটাকে কোনো শরঈ ইবাদাত মনে করার সুযোগ নাই। কারণ এ দিনের কোনো আমল সম্পর্কে কোরআন সুন্নাহের কোনো নির্দেশ আছে বলে আমার জানা নাই। এটা শুধু আল্লাহ তাআলার রাসুলের সাথে ভালোবাসার স¤পর্ক হিসেবে দেখব। এটাই ইবাদাতের দিন হিসেবে গণ্য করাও ঠিক হবে না।
আখেরি চাহার শোম্বার এর ভ্রান্তি নিরসন
শরিয়াতের দৃষ্টিতে এ দিবস পালনের প্রেক্ষাপট এবং এ দিবসে বর্ণিত কোনো আমলই নির্ভরযোগ্য দলিলের ভিত্তিতে প্রমাণিত নয়। বরং তা একটি গর্হিত বিদাত ও অবশ্য পরিত্যজ্য বিষয়।এ দিবসের বিদাত হওয়ার কারণগুলো বর্ণিত হলো-
 রাসুল (সা.) কে এক ইহুদি জাদু করেছিল, এ কথা ঠিক। তবে গোসলের মাধ্যমে সুস্থতার তারিখ হিসেবে সফর মাসের শেষ বুধবার কথাটি সঠিক নয়। বরং দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। হাফেজ ইবনে হাজার (রহ.) ও হাফেজ ইবনে কাসির (রহ.) এ দিনটি বৃহ¯পতিবার ছিল বলেই উল্লেখ করেছেন। (ফাতহুল বারি, কিতাবুল মাগাজি, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া)।
 এ গোসলের পর রাসুল (সা.) আর গোসল করেননি এ কথাও ঠিক নয়। কেননা, সহি হাদিসসমূহে স্পষ্ট উল্লেখ আছে, রাসুল (সা.) এরপর এশার নামাজের আগে এক রাতে গোসল করেছিলেন। (মুসলিম, বুখারি)।
 সাহাবীগণ (রা.) খুশি হয়ে এ দিন রোজা রেখেছিলেন এবং নফল নামাজ আদায় করেছিলেন এ কথাও সম্পূর্ণ  ভিত্তিহীন! এ জাতীয় কোনো বর্ণনা হাদিসের কোনো কিতাবেই উল্লেখ নেই।
 কোনো বিশেষ দিনকে ধর্মীয় দিবস মনে করা এবং তাতে বিভিন্ন ইবাদত-বন্দেগি করার জন্য শরিয়াতের সুনির্দিষ্ট দলিল-প্রমাণ আবশ্যক। অথচ কোরআনে কারিম কিংবা হাদিসে এ দিবসের উল্লেখ দূরের কথা, সাহাবায়ে কিরাম, তাবেইন, তাবে-তাবেইনের যুগ তথা সর্বশ্রেষ্ঠ তিন যুগেও এ দিবস পালনের কোনো রেওয়াজ পাওয়া যায় না।
 দাওয়াতুনবীর দায়িত্ব আঞ্জাম দিতে গিয়ে রাসুল (সা.) কাফিরদের পক্ষ থেকে অনেক দুঃখ-কষ্ট ভোগ করেছেন। আল্লাহ তাআলা তাঁকে সেসব কষ্ট থেকে মুক্তিও দিয়েছেন। এ ছাড়া আল্লাহ তাআলা তাঁকে অনেক নিয়ামতও দান করেছেন।রাসুল (সা.) এর এ কষ্ট থেকে মুক্তিপ্রাপ্তি কিংবা কোনো নিয়ামত লাভ করা নিঃসন্দেহে উম্মতের জন্য আনন্দ ও খুশির বিষয়। কিন্তু এ খুশির দিনকে ইসলামী দিবস হিসেবে পালন করা হয়েছে-মর্মে সাহাবায়ে কিরামের জীবনীতে এর কোনো উল্লেখ নেই!
তাই বলতে হয়, এ দিনে রাসুলকে (সা.) স্বরণ করে বিশেষ কিছু করাকে প্রয়োজন মনের করা ইসলামে অবৈধ। তবে জরুরী মনে না করে এমন সাধারণ দিন ভেবে রাসুল (সা.)এর জীবন আদর্শ স¤পর্কে আলোচনা করা, তাঁর স্বরণে বেশী বেশী দরুদ পাঠ করা ভালো কাজ। সার কথা, আখেরি চাহার শোম্বা দিবসের প্রেক্ষাপট হিসেবে বর্ণিত কারণগুলো যেমন ভিত্তিহীন, তেমনি এ দিবসকে ইসলামী দিবস মনে করাও প্রমাণবিহীন!

কাজেই বিশেষ কোনো আমলকে এ দিবসের আমল করারও কোনো সুযোগ নেই। সাহাবায়ে কিরাম, তাবেইন ও তাবে-তাবেইনরা রাসুল (সা.) আনুগত্যে যে পথনির্দেশ রেখে গিয়েছেন উম্মতের হিদায়াত ও জান্নাতপ্রাপ্তির জন্য তা-ই যথেষ্ট। এ জাতীয় মনগড়া দিবসের বিদাতে লিপ্ত হওয়া এবং তাতে নির্ধারিত ইবাদত-বন্দেগিকে দিবসকেন্দ্রিক মনে করা মারাত্মক গুনাহর কাজ। কাজেই বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় এই ভিত্তিহীন দিবসের যৌক্তিকতা আলোচনা করা যেমন ঠিক নয়, তেমন এ দিবসকে কেন্দ্র করে সরকারি ছুটি পালনের কোনো যৌক্তিকতা নেই। আল্লাহ তাআলা আমাদের এ গর্হিত বিদাত থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন। আমীন

লেখকঃ প্রভাষক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ,আতাকরা কলেজ, কুমিল্লা, বাংলাদেশ ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *